আগৈলঝাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি : দক্ষিণাঞ্চলীয় বরিশাল বিভাগের অন্যতম আসন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বরিশাল-১ আসনটি। আগৈলঝাড়া ও গৌরনদী উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে গৌরনদীর ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা, আগৈলঝাড়ার ৫ ইউনিয়নের অবস্থান। হালনাগাদ ভোটার তালিকা অনুযায়ী এখানে ২ লাখ ৫৭ হাজার ২শ’ ২০ জন ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৭ জন পুরুষ ও ১ লাখ ২৮ হাজার ২০৩ জন নারী। এই আসনে বরাবর ভোটযুদ্ধ হয়েছে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি’র মধ্যে। তবে এবছর এর অনেকটা ব্যতিক্রম চিত্র প্রত্যক্ষ করছেন সাধারণ জনগণ। দীর্ঘ একযুগ এলাকা থেকে জনবিচ্ছিন্ন বিএনপি প্রার্থীর নড়বড়ে অবস্থান আর তাদের অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলের কারণে বিএনপি এবছর মাঠ গুছাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। রাজনীতি আর ভোটের মাঠে বিএনপি প্রার্থী না থাকায় দলের নেতাকর্মী ও ভোটাররা চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ।
এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে, মন্ত্রী পদমর্যাদার আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্ একক প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। আওয়ামীলীগ সরকারের টানা ১০ বছরে নির্বাচনী এলাকা অবস্থান করে এলাকার সর্বত্রই ব্যাপক উন্নয়নের ছাপ রেখেছেন তিনি। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নযন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হওয়ায় এলাকায় বিশেষ বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
অপরদিকে এই আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি জহির উদ্দিন স্বপন। ২০০১ সালে এই আসন থেকে তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় বিএনপি’র সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জহির উদ্দিন স্বপন ওয়ান ইলেভেনের সময় হাসিনা-খালেদা মাইনাস-২ ফর্মুলা বাস্তবায়নের ক্রীড়নক হিসেবে খালেদা জিয়া ও জিয়া পরিবার সম্পর্কে টিভি চ্যানেলের টক শোতে নেতিবাচক বক্তব্যের কারণে দল থেকে বহিস্কৃত হন। ২০০১ সালে এমপি হয়েও নির্বাচনোত্তর সংখ্যালঘু ও আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের নির্যাতন ও দমন-পীড়ন, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভায় নির্যাতিতা ইউপি সদস্য কমলা রানী রায়ের হাটে হাড়ি ভেঙ্গে দেয়া ও ওয়ান ইলেভের কুশীলব হিসেবে সারাদেশে আলোচিত সমালোচিত হয় স্বপন। বামপন্থী সাবেক তুখোড় ছাত্রনেতা স্বপন সাংসদ ও দলীয় পদ হারিয়ে নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেন। গত একযুগ তার জনবিচ্ছিন্নতার সুযোগে এখানে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, বরিশাল জেলা বিএনপি (উ:) সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান ও কেন্দ্রীয় বিএনপি’র সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহান। তরাও এবার দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করেন। দল থেকে প্রাথমিকভাবে সোবহান ও স্বপনকে নির্বাচিত করে। বিএনপি’র নমিনেশন দৌঁড়ে সোবহানকে টপকে মনোনয়ন কব্জা করে নেন জহির উদ্দিন স্বপন। জনবিচ্ছিন্নতার অভিযোগে স্বপনের মনোনয়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখা দেয় দলে। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা তার মনোয়নের বিরুদ্ধে আগৈলঝাড়া উপজেলা বিএনপি সভাপতি আ: লতিফ মোল্লার বাড়িতে তার সভাপতিত্বে প্রতিবাদসভা করে বিএনপি’র মহাসচিবের কাছে মনোনয়ন পরিবর্তনেরও দাবি জানায়।
এদিকে গত ১৭ ডিসেম্বর দুপুরে গৌরনদী উপজেলার সরিকল গ্রামের নিজবাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি প্রার্থী স্বপন ২০০১ সালে তিনি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা নির্যাতনের ১৭ বছর পর সেই সময়ের এমপি হিসেবে দু:খ প্রকাশ করে ক্ষমা প্রার্থণা করে নির্যাতিতদের প্রতি সহানুভুতি ও সমবেদনা জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে যদি তার হাতে সুযোগ আসে তাহলে ১৭ বছর হোক আর ৩৭ বছর হোক যেকোন অপরাধ আইনের আওতায় নেয়ার চেষ্টা করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে স্বপন প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তার কঠোর সমালোচনা করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুতের মিথ্যাচার স্বচোখে দেখতে সিইসিকে তার বাড়িতে এক রাতের অতিথি হবারও আমন্ত্রণ জানান। স্বপনের অভিযোগ, স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতার্মীরা বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উপর এবং তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় প্রশাসন কার্যকরী কোন ভূমিকা পালন করছেন না। এসব ঘটনায় থানায় লিখিতভাবে অভিযোগ দায়ের করা হলেও পুলিশ রহস্যজনক ভূমিকা পালন করছে। তিনি আরও বলেন, তার নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা এবং পোস্টার টানাতে বাঁধা প্রদান করছে প্রতিপক্ষের লোকজন।
উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা এসএম আফজাল হোসেন বলেন, দলের প্রার্থীর কাছ থেকে কোন সাড়া না পাওয়ায় নির্বাচনী মাঠে এখনও নামতে পারছেন না তারা। যদি দলের সকল নেতাকে নিয়ে স্বপন এক প্ল্যাটফর্মে আসতে পারেন তবে তারা নির্বাচনী মাঠে নামবেন। এমন নিরুত্তাপ নির্বাচন এর আগে জীবনে কখনও দেখেননি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সভাপতি আ: লতিফ মোল্লা বলেন, বিএনপির প্রার্থী থাকলেও মাঠ ফাঁকা। মনোনয়নয়ন প্রাপ্তির পর দীর্ঘ সময় পার হলেও দলের প্রার্থী স্বপনের নিস্ক্রিয়তার কারণে বর্তমান নির্বাচনী মাঠে নেই কোন উত্তাপ। মাঠে বিএনপি না থাকায় পুরো মাঠ এখন আওয়ামীলীগের দখলে। দলের নেতাকর্মীদের বরাত দিয়ে তাদের সাথে একমত পোষন করে তিনি আরও বলেন, স্বপন এবার নির্বাচন করতে আসেন নি। তিনি একযুগ নেতাকর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে বিএনপিতে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে ‘রাজনৈতিক গেইন’ নিতেই শুধু দলের মনোনয়ন নিয়েছে। নির্বাচনের অল্পদিন বাকি থাকলেও এখন পর্যন্ত (১৯-১২-১৮) ধানের শীষের পোস্টার চোখে পরেনি বরিশাল-১ নির্বাচনী এলাকার কোথাও।
জেলা (উ:) বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, নির্বাচনী মাঠে না থাকতে পারা বিএনপি’র প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপনের ব্যর্থতা। সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা স্বপনের ‘নির্বাচনী নাটক’ বলে অভিহিত করে ২০০১ সালে সংখ্যালঘু নির্যাতনের সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, ওই ঘটনা বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে ঘটায়নি বা তাতে বিএনপি’র কোন মদদ ছিলনা। এর দায়ও বিএনপি নেবেনা। তৎকালীন এমপি হিসেবে স্বপন ও তার অনুসারীদের দ্বারা সংঘঠিত অপরাধ ও দায় একান্তই তার ব্যক্তিগত।
এই আসনে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র মনোনয়নপ্রাপ্ত ও এবছর দলের অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান মনোনয়নপ্রাপ্ত স্বপন সম্পর্কে বলেন, মনোনয়ন প্রদানের আগেই তিনি নিরাপত্তা চেয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেন। তিনি কিভাবে প্রচারণা চালাবেন এটা তার বিষয়। ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন ও রামশীল ঘটনা’ স্বপনই ঘটিয়েছে। এটা ন্যাক্কারজনক উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, যার কারণে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেনকে আগৈলঝাড়ায় আসতে হয়েছিল। এসকল ঘটনা আমি দলীয় হাইকমান্ডকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম। কিন্ত তারপরেও তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন। তাদের দেয়া মনোনয়নের ব্যাপারে কিছু মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। তবে ২০০১ এর হামলা, নির্যাতনের ওই দায় বিএনপি নেবেনা। এসব ন্যাক্কারজনক ঘটনা স্বপনের স্বীকৃত নিজস্ব দায়।
এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থী রাসেল সরদার (হাতপাখা), জাকের পার্টির বাদশা মুন্সী (গোলাপ ফুল) দুই উপজেলাতে তাদের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

(Visited 1 times, 1 visits today)

সম্পাদক ও প্রকাশক

কাজী জাহাঙ্গীর আলম সরকার।

ই-মেইল: jahangirbhaluka@gmail.com
নিউজ: bsomoy71@gmail.com

মোবাইল: ০১৭১৬৯০৭৯৮৪

%d bloggers like this: